মরিচ চাষ

লিখেছেন .

তারিখ .June 21, 2016.... বিভাগ. .মরিচ

 

বাঙ্গালী রান্নায় মসলা হিসেবে মরিচ একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। কাঁচা হোক কিংবা পাকা অথবা শুকনা সকল অবস্থায়ই এর ব্যবহার হয়। রয়েছে পুষ্টিগুনও।মরিচ বিভিন্ন ধরনের আচার তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়। আবার অনেকের আচার তৈরির প্রধান উপকরণও হয় মরিচ।

মরিচের পুষ্টিগুন:
কাঁচা মরিচ স্বাস্থ্যের জন্য খুবই এতে আছে ভিটামিন এ, সি, বি-৬, আয়রন,
পটাশিয়াম এবং খুবই সামান্য পরিমাণে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট।আছে বিটা ক্যারোটিন ও আলফা ক্যারোটিন, বিটা
ক্রিপ্টোক্সানথিন ও লুটেইন জিয়াক্সানথিন ইত্যাদি উপাদান। এগুলো ত্বক ও স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।

মরিচের পুষ্টিগুন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন।


পুষ্টিগুণ
মাটি নির্বাচন:
বেলে দো-আঁশ থেকে এটেল দো-আঁশ মাটিতে মরিচ চাষ করা হয়। জৈব পদার্থযুক্ত দো-আঁশ মাটি উত্তম। মরিচ মৃদু অম্ল মাটিতে ভাল হলে সবচেয়ে ভালো হয়। ক্ষারীয় মাটিতে ফলন ভালো হয় না। সারাদিন রোদ পায় ও বৃষ্টির সময় পানি দাড়ায় না এমন জমি মরিচ চাষের উপযোগী।
জাত নির্বাচন:
ঝাল ও মিষ্টি এ ধরনের মরিচ দেখা যায়। ঝাল মরিচের মধ্যে বগুড়া, চাঁদপুরী, ফরিদপুরী উল্লেখযোগ্য। এছাড়া কামরাংগা, আকালী ও কালো মরিচ খুব ঝাল।
উফশী জাত– বারি মরিচ-১।
স্থানীয় জাত:
হাইব্রিড জাত–
বিভিন্ন জাতের বৈশিষ্ট্য ও ফলন বিস্তারিত দেখতে ক্লিক করুন
জমি প্রস্তুতকরণ:
মাটি ও জমির প্রকারভেদে জমিতে ৪ থেকে ৬টি চাষ ও মই দিতে হয়। প্রথম চাষ গভীরভাবে হওয়া দরকার।
চারা উৎপাদন পদ্ধতি
এক বীজতলায় চারা গজিয়ে অন্য বীজতলায় স্থানান্তর করলে ভাল চারা পাওয়া যায়। বীজতলা ৩ মিটার দৈর্ঘ্য, ১ মিটার প্রস্থ এবং ৪০ সে.মি. উঁচু হতে হবে। বীজতলার উপরের মাটিতে বালি ও কমপোষ্ট বা শুকনা পচা গোবর সম পরিমাণ মিশিয়ে ঝুরঝুরা করে নিতে হয়। বীজ বপনের ৬ ঘন্টা পূর্বে ভিটাভেক্স বা ক্যাপটান (১ গ্রাম/৫০০ গ্রাম বীজ) দ্বারা বীজ শোধন করতে হয়। বীজ প্রথম বীজতলায় ৫ সে.মি. দুরে দুরে সারি করে ঘন বীজ বপন করতে হয়। বীজ বপনের পোকামাকড় থেকে রক্ষার জন্য সেভিন ২গ্রাম/প্রতি লিটার পানিতে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হয়। অতিবৃষ্টি বা প্রখর রোদ থেকে রক্ষার জন্য বাঁশের চাটাই বা পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে দিতে হবে। বীজ গজানোর পর ১০-১২ দিন বয়সের চারা দ্বিতীয় বীজ তলায় ২.৫ সে.মি. (১ ইঞ্চি) দূরত্বে চারা লাগানো হয়।
বীজের পরিমাণ: সাধারণত এক হেক্টর জমিতে চারা লাগানোর জন্য ৮০০-১০০০ গ্রাম মরিচ বীজ দরকার হয়।

বীজ শোধন: বপনের ৬ ঘণ্টা আগে প্রোভেক্স বা ক্যাপটান (১ গ্রাম/৫০০ গ্রাম বীজের) দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে। বীজ গজানোর জন্য বপনের আগে ৪৮ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে।
বীজ বপণ ও চারা রোপণ: ঝাল মরিচ বছরের প্রায় যেকোনো সময়ই জন্মে। বর্ষা মৌসুমের জন্য মার্চ-এপ্রিল মাসে এবং রবি মৌসুমের জন্য অক্টোবর-নভেম্বর মাস পর্যন্ত বীজ বপণের উপযুক্ত সময়। চারা রোপণ করার সময় সারি থেকে সারি ৬০-৭০ সে.মি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব হবে ৩০ থেকে ৪০ সে.মি. । চারা বিকেলে লাগাতে হবে এবং ২-৩ দিন সকাল বিকাল পানি দিতে হবে।
সার প্রয়োগ:
সার মাটির অবস্থা ও গুণাগুণ দেখে পরিমাণ মতো দেয়া উচিত। জমির উর্বরতা ভেদে সারের মাত্রা কম-বেশী হয়।

morich

সেচ ও নিকাশ: জমিতে রসের অভাব হলে সেচ দিতে হবে ও পানি নিকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পরিচর্যা: আগাছা দেখা দিলে তা পরিষ্কার করতে হবে এবং উপরি সার প্রয়োগের সময় কোদাল দিয়ে কুপিয়ে আলগা করে দিতে

পোকা দমন :

১. সাদা মাছি:sada machi
আক্রমনের লক্ষণ: এ পোকা পাতার রস চুষে খায় ফলে পাতা কুঁচকে যায় এবং গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। প্রথমে পাতায় সাদা বা হলদেটে রং দেখা যায় পরে দাগগুলো একত্রে হয়ে সবুজ শিরাসহ পাতা হলুদ হয়ে যায়।
ব্যবস্থাপনা: সবিক্রন ৪২৫ ইসি- ২ এমএল/ প্রতি লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে ভালভাবে গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করুন।
২.থ্রিপস:capsicumthrips (1)
আক্রমনের লক্ষণ: পাতার রস চুষে খায় বলে পাতা কুঁকড়িয়ে যায় এবং অনেকটা নৌকার মত দেখায়।
ব্যবস্থাপনা: ইমিডাক্লোরপ্রিড ২০ এসএল ( টিডো, এডমায়ার, ইমিটাফ) ০.৫০/মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।
৪. জাব পোকা:jabpoka

আক্রমনের লক্ষণ: ফুল কচি ফল ও ডগার রস চুষে খায়।
– পাতা কুঁকড়ে যায়, গাছের বৃদ্ধি ও ফুল, ফল ধারণ বাধাগ্রস্থ হয়
কালো শুটি মোল্ড ছত্রাক জন্মাতে দেখা যায়।
দমন: ইমিডাক্লোরপ্রিড ২০ এসএল ( টিডো, এডমায়ার, ইমিটাফ) ০.৫০/মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।

৫. ফলছিদ্রকারী পোকা:

আক্রমনের লক্ষণ: কীড়া ফলের বোটার কাছে ছিদ্র করে ভেতরের অংশ খায়।
ফলের ভেতর কীড়ার বিষ্ঠা ও পচন দেখা যায়।
– আক্রান্ত ফল অসময়ে পাকে।

দমন:– প্রতি বিঘায় ১৫ টি হারে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে পুরুষ মথ মেরে ফেলা।

৬. মরিচের মাকড়:mite (1)

আক্রমনের লক্ষণ: পাতার নীচে থেকে রস চুষে খায় ফলে পাতার শিরার মধ্যকায় এলাকার বাদামী রং ধারণ করে ও শুকিয়ে যায়।
– আক্রান্ত পাতা কুঁকড়িয়ে যায় এবং কচি পাতার নীচের দিকে বেঁকে পেয়ালা আকৃতির হয়ে যায় ও পাতা সরু হয়।
– ব্যাপক আক্রমণে পাতা ভেঙ্গে যায়।

দমন:– পাইরিথ্রয়েড জাতীয় কীটনাশক প্রয়োগ যথা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
– অনুমোদিত মাকড়নাশক প্রয়োগ করতে

রোগ দমন :

. ঢলে পড়া বা গোড়া ও মূল পচা রোগ: dolepora

আক্রমনের লক্ষণ: এ রোগটি নার্সারিতে হয়ে থাকে।বীজ অঙ্কুরোদ্গমের পরই কচি চারায় গোড়ায় পানিভেজা দাগ পড়ে ও পরে তা কুঁচকে গিয়ে চারা ঢলে পড়ে ও মারা যায়।
প্রতিকার :  প্রোভেক্স-২০০ (২.৫ গ্রাম/ প্রতি কেজি) দ্বারা বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
 কিউপ্রাভিট অথবা ব্যাভিস্টিন প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে আক্রান্ত গাছের গোড়ার মাটিতে স্প্রে করতে হবে।

২.ব্যাকটেরিয়া জনিত পাতায় দাগ : pata dag

আক্রমনের লক্ষণ: পাতা শুকিয়ে গাছ মারা যায়। সবুজ ফল বাদামী হতে কালো হয়।
রোগের প্রতিকারঃ-
 রোগ মুক্ত বীজ সংগ্রহ এবং বীজ শোধন করতে হবে।
 আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে ফেলতে হবে।
 রোগের প্রাথমিক অবস্থায় কপার অক্রিক্লোরাইড (সানভিট বা কুপ্রভিট) ৬-৭ গ্রাম/প্রতি লিটার পানিতে হারে মিশিয়ে গাছে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

৩. ফিউজারিয়াম ঢলে পড়া রোগ:

আক্রমনের লক্ষণ: ছত্রাক গাছের নিচের দিকে কান্ডে আক্রমণ করে এবং গাঢ় বাদামি ও ডুবা ধরনের ক্যাঙ্কার সৃষ্টি করে। গাছের অগ্রভাগের পাতা হলুদ হয়ে যায়, পরে পুরো গাছ হলুদ বর্ণ ধারণ করে।
প্রতিকার :  প্রোভেক্স-২০০ অথবা ব্যাভিস্টিন ২.৫ গ্রাম/প্রতি কেজি হারে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।

 ব্যাভিস্টিন ২ গ্রাম/ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত গাছের গোড়ার মাটিতে স্প্রে করতে হবে।

৪. আগা মরা/ক্ষত/ফল পচা/ এনথ্রাকনোজ বা ডাইব্যাক রোগ: aga mora

আক্রমনের লক্ষণ: রোগের আক্রমণে পাতা, কান্ড ও ফল ক্রমে ওপর হতে মরতে থাকে এবং গাছ ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করে।
ফলের গায়ে গোলাকার কালো গাঢ় ক্ষতের দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে ফল পচে দেয়।

প্রতিকার :  প্রোভেক্স-২০০ অথবা ব্যাভিস্টিন ২.৫ গ্রাম/প্রতি কেজি হারে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
 রোগ দেখা গেলে প্রপিকোনাজল ( টিল্ট ২৫০ ইসি বা প্রাউড) ০.৫ মিলি/প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

৫. অলটারনারিয়া ফল পচা রোগ:chilli_rot_23oct

আক্রমনের লক্ষণ: ফলের আগার দিকে বড় উপবৃত্তাকার থেকে ডিম্বাকৃতি দাগ পড়ে। দাগগুলোর ভিতরে বাদামি কালো রং ও বাইরে হলদে ধূসর ধারণ করে।

প্রতিকার :  প্রোভেক্স-২০০ ২.৫ গ্রাম/প্রতি কেজি হারে বীজ শোধন করে করতে হবে।
 রোভরাল ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

৬.পাতা পচা রোগ:

আক্রমনের লক্ষণ: প্রথমে পাতায় পানিভেজা দাগ হয়। এরপর পাতা দ্রুত পচতে থাকে। শাখা-প্রশাখা, পাতা, ফুল-ফল আক্রান্ত হতে পারে।পাতা দ্রুত পচতে থাকে। পচন গাছের উপর থেকে নিচে নামতে থাকে।আক্রান্ত গাছের পাতা ও ডাল কালো রঙের হয়ে থাকে।

প্রতিকার : জমিতে পরিমিত সেচ দেয়া । ব্যাভিস্টিন ১ গ্রাম /প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২-৩বার স্প্রে করতে হবে।

ফসল সংগ্রহঃ ফুল আসার পর ১৫-২০ দিনের মধ্যে কাঁচা মরিচ তোলা হয়। তবে মরিচের রং লাল হলে তুলে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। প্রতি হেক্টরে ফলন কাঁচা ১০-১১ টন ও শুকনো ১.৫-২.০

 

 

♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦

Leave a Reply

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা পুরোপুরি বা আংশিক নকল করে অন্য কোথাও প্রকাশ/প্রিন্ট করা সম্পূর্ণ বেআইনি। তবে অব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কোন প্রকার অনুমুতি ছাড়াই কন্টেনসমূহ ব্যবহার করা যাবে। সূত্রসহ সম্পূর্ণ লেখা অন্য কোথাও প্রকাশ করা যাবে।

Designed & Developed by Alamgir Hossain

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.