করলা চাষ

লিখেছেন .

তারিখ .June 27, 2016.... বিভাগ. .করলা

তেতো স্বাদের বলে অনেকেই করলা খেতে চান না। কিন্তু সবজি হিসেবে করলার জুড়ি মেলা ভার। পুষ্টির হিসেবের বেলায় তো তুলনাহীন। অনেকেই হয়তো জানেন না শাক হিসেবেও করলার পাতা অত্যন্ত পুষ্টির খাবার। করলা গ্রীষ্মকালীন একটি সবজি হলেও এখন প্রায় সারা বছরই পাওয়া যায়।

করলার পুষ্টিগুন: প্রতি ১০০ গ্রাম করলায় পাবেন খাদ্যশক্তি ১৭ কিলোক্যালরি, কার্বোহাইড্রেটস ৩.৭০ গ্রাম, প্রোটিন ১ গ্রাম, খাদ্যআঁশ ২.৮০ গ্রাম, ফোলেট ৭২ মাইক্রো গ্রাম, নিয়াসিন ০.৪০০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ৪৭১ আইইউ, ভিটামিন সি ৮৪ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ৫ মিলিগ্রাম, পটাসিয়াম ২৯৬ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৯ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ১৭ মিলিগ্রাম। রোগ নিয়ন্ত্রনে এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

করলা পুষ্টিগুন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন।

মাটি নির্বাচন: প্রায় সব শ্রেনির মাটিতে করলা চাষ করা যায়। দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি করলা চাষের জন্য বেশি উপযোগী।

জাত নির্বাচন: করলা চাষে জাত নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি হাইব্রিড, নাকি উফশী জাত চাষ করবেন।
উফশী জাত বারি করলা-১ ও গজ করলা।
হাইব্রিড জাত বুলবুলি, টিয়া, প্যারট, গৌরব, গ্রীন রকেট, হীরক, মানিক, জয় , রাজা, প্রাচী ইত্যাদি।
বিভিন্ন জাতের বৈশিষ্ট্য ও ফলন বিস্তারিত দেখতে ক্লিক করুন।

জমি প্রস্তুতকরণ: করলা চাষের জন্য জমি ৪-৫ টি চাষ ও মই দিয়ে উত্তম রূপে জমি প্রস্তুত করতে হবে। জমি তৈরির সময় ভার্মি কম্পোষ্ট ব্যবহার অতি উত্তম। অথবা একরে ৪০০/৫০০ কেজি পচা গোবর সার ব্যবহার করতে হবে।মই দিয়ে জমি সমান করার পর সেচ ও পানি নিকাশের জন্য ১ মিটার চওড়া বেড করে তার মাঝে ৩০ সেন্টিমিটার চওড়া করে নালা রাখতে হবে।

মাদা তৈরী : প্রতি মাদায় কমপক্ষে ২টি বীজ বপন অথবা পলিব্যাগে উৎপাদিত ১৫-২০ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে। করলার জন্য সারিতে ১.৫ মিটার দূরত্বে এবং উচ্ছের ক্ষেত্রে ১.০ মিটার দূরত্বে মাদা তৈরী করতে হবে। মাদা বীজ বুনতে বা চারা রোপণ করতে হলে অন্তত: ৭-১০ দিন আগে মাদায় জৈব সারসহ সুষম সার প্রয়োগ করে মাদা প্রস্তুত করে নিতে হবে। মাদা হবে লম্বা, চওড়া ও গভীরতায় কমপক্ষে ৩০ সেমি।
বীজের পরিমাণ: সাধারণত প্রতি শতকে করলা চাষের জন্য ১৫ থেকে ২০ গ্রাম বীজ দরকার হয়।

বীজ বপনের সময়: ফেব্র্বয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে যে কোন সময় করলার বীজ বোনা যেতে পারে। করলার বীজে বপনের পূর্বে ২/১ দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। প্রতিটি মাদায় ৪-৫টি বীজ বপন করতে হবে। তারপর মাদায় সুস্থ সবল ২-৩টি চারা রেখে বাকি চারা তুলে ফেলতে হবে।

সার প্রয়োগ: সার মাটির অবস্থা ও গুণাগুণ দেখে পরিমাণ মতো দেয়া উচিত। জমির উর্বরতা ভেদে সারের মাত্রা কম-বেশী হয়।

সারের নাম মোট পরিমাণ (শতাংশ প্রতি) জমি তৈরির সময় (শতাংশ প্রতি) চারা রোপণের ৭-১০
দিন পূর্বে
চারা রোপণের ১০-১৫
দিন পর
চারা রোপনের ৩০-৩৫
দিন পর
চারা রোপনের ৫০-৫৫
দিন পর
চারা রোপনের ৭০-৭৫
দিন পর
পচা গোবর ৮০ কেজি ২০ কেজি ৫ কেজি
ইউরিয়া ৭০০ গ্রাম ১৫ গ্রাম ১৫ গ্রাম ১৫ গ্রাম ১৫ গ্রাম
টিএসপি ৭০০ গ্রাম ৩৫০ গ্রাম ৩০০ গ্রাম
এমওপি ৬০০ গ্রাম ২০০ গ্রাম ২০ গ্রাম ১৫ গ্রাম
জিপসাম ৪০০ গ্রাম ৪০০ গ্রাম
দস্তা ৫০ গ্রাম ৫০ গ্রাম
বোরাক্স ৪০ গ্রাম ৪০ গ্রাম
ম্যাগনেশিয়াম ৫০ গ্রাম ৫ গ্রাম

সেচ ও নিকাশ: জমিতে রসের অভাব হলে সেচ দিতে হবে ও পানি নিকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পরিচর্যা: জমিতে আগাছা দেখা দিলে আগাছা দমন করতে হবে। চারা ১০-১৫ সেমি লম্বা হলে গাছের গোড়ার পাশে মাচায় উঠার জন্য কাঠি পুঁতে দিতে হবে । পরবর্তীতে মাচা তৈরি করে দিতে হবে। এবং মাঝে মধ্যে নিড়ানীর মাধ্যমে গাছের গোড়ায় মাটি দিয়ে উঁচু করে দিতে হবে।

পোকা দমন :

১. ফলের মাছি পোকাঃ
আক্রমনের লক্ষণ: কচি ফলের গায়ে স্ত্রী মাছি পোকা ২-৫টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে পোকার কীড়াগুলো আক্রান্ত ফলে ভিতর ঢুকে এবং ফলের শাঁস খায়। আক্রান্ত ফল অকালে ঝরে পড়ে।pawdari milview
ব্যবস্থাপনা: আক্রান্ত ফল কীড়াসহ সংগ্রহ করে মাটির গভীরে পুতে ফেলতে হবে। বিষটোপ ও ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে। একটি মাটির পাত্রে ১০০ গ্রাম থেতলানো মিষ্টি কুমড়ার সাথে ০.২৫ গ্রাম সেভিন ৮৫ ডব্লিউ পি মিশিয়ে বিষ টোপ তৈরী করতে হবে। বিষটোপ ৩-৪দিন পরপর পরিবর্তন করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে রিপকর্ড বা ফাইটার ২০ ইসি প্রতিলিটার পানির সাথে ১ মিলি হারে মিশিযে ১৫ দিন অন্তর ২-৩ বার ¯স্প্রে করতে হবে।
২.লাল কুমড়া বিটলঃ
আক্রমনের লক্ষণ: পূর্ণ বয়স্ক পোকা পাতা ও ফল খেয়ে ফেলে।
ব্যবস্থাপনা: এ পোকা দমনের জন্য জমি সর্বদা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। হাত দিয়ে পোকা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে। এ ছাড়া জমিতে সুমিথিয়ন জাতীয় কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ¯স্প্রে করতে হবে।
৩. কাঁটালে পোকাঃ

আক্রমনের লক্ষণ: এ পোকা করলার পাতার সবুজ অংশ খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। আক্রান্ত পাতা বিবর্ণ জালের মতো দেখায়। গাছের আক্রান্ত পাতাগুলো ঝরে পড়ে এবং গাছ পাতা শূণ্য হয়ে পড়ে।
দমনঃ ইমিডাক্লোরপ্রিড ২০ এসএল ( টিডো, এডমায়ার, ইমিটাফ) ০.৫০/মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছের পাতা ভালভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।

রোগ দমন :

. করলা পাতার গুচ্ছ রোগ

আক্রমনের লক্ষণ: এভাইরাস ঘটিত এ রোগের আক্রমণে গাছের পাতাগুলো গুচ্ছ আকারে দেখা যায়। গাছ বাড়ে না, ফুল ও ফল কমে যায়।
প্রতিকার : আক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে পুড়িয়ে ফেরতে হবে। বাহক পোকা দমনের জন্য টিডো বা এডমায়ার নামক কীটনাশক ০.৫০ মিলি/প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

২.পাউডারি মিলডিউ:

আক্রমনের লক্ষণ: পাতায় ধূসর বর্ণের পাউডার পড়ে। পাতা নষ্ট হয়ে যায় , ফুল ও ফল কম হয়।
রোগের প্রতিকারঃ-রোগমুক্ত বীজ বপন করতে হবে। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম থিয়োভিট মিশিয়ে ১০-১৫ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।

৩. ডাউনি মিলডিউঃ
আক্রমনের লক্ষণ: পাতার ওপর ছোট ছোট হলুদ দাগ পড়ে। পাতা ঝলসে ও কুচকে যায়। পাতার নিচে গোলাপী দাগ দেখা যায়।
প্রতিকার :কার্বেন্ডাজিম ৫০ডব্লিউপি ( ব্যাভিস্টিন/ জিমগার্ড/ এমকোিজম/ গোল্ডাজিম/ সিনডাজিম/ নোইন/ সিডাজিম / আরবা/ গিলজিম / জেনুইন/ হেডাজিম/টপসিল প্লাস/ সানফানেট) যে কোন একটির তিন গ্রাম/ ৩ মিঃলিঃ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে এক কেজি বীজ/ কন্দ আধা ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে শোধন করে উঠিয়ে ছায়ায় শুকিয়ে নিয়ে জমিতে বপন করুন।
প্রথম রোগ লক্ষণ দেখা দেওয়ার শুরুতে নিম্নরুপ রাসায়নিক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারেঃ
আইপ্রোডিন ৫০জি ( রোভরাল/ রোভানন) ২গ্রাম/ মিঃলিঃ অথবা
কপার হাইড্রোঅক্সসাইড
( চ্যাম্পিয়ন) ২ গ্রাম প্রতি লিটার পনিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করা যেতে পারে।

ফসল সংগ্রহঃ বীজ বপনের ৫০-৬০ দিন পর গাছে ফল ধরে। ফল ধরার ১২-১৫ দিন পর করলা সংগ্রহ করতে হয়।

118179 Views

♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦◊♦

Leave a Reply

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা পুরোপুরি বা আংশিক নকল করে অন্য কোথাও প্রকাশ/প্রিন্ট করা সম্পূর্ণ বেআইনি। তবে অব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কোন প্রকার অনুমুতি ছাড়াই কন্টেনসমূহ ব্যবহার করা যাবে। সূত্রসহ সম্পূর্ণ লেখা অন্য কোথাও প্রকাশ করা যাবে।

Designed & Developed by Alamgir Hossain

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.